রাজশাহীর পবা উপজেলার মুরারিপুর এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নূহ আলম। দুই সপ্তাহ ধরে তার সাড়ে আট মাস বয়সী অসুস্থ শিশুসন্তানকে নিয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে আছেন। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুটির প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট। হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা শিশুসন্তানের এমন কষ্ট আর সহ্য হয় না। নীরবে চোখের পানি ফেলছেন। শিশুকে বাঁচাতে চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন; কিন্তু আইসিইউতে বেড খালি নেই। সিরিয়াল দিয়ে আইসিইউর সামনে অপেক্ষা করছেন। তার সিরিয়াল নম্বর-২৭। যদি বেড খালি হয়, এই আশায় দিন কাটে আইসিইউর সামনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইসিইউ পাওয়া যাবে কিনা নিশ্চিত নন। কারণ আইসিইউতে সাধারণত রোগীদের দীর্ঘ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় বলে সহজে বেড খালি হয় না। ফলে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে অপেক্ষা করতে হচ্ছে নূহ আলমকে। এভাবে অপেক্ষায় থেকে গত আড়াই মাসে ৫৩টি শিশু মারা গেছে।
একইভাবে গত ১১ থেকে ২২ মার্চের মধ্যে রামেক হাসপাতালে আইসিইউর জন্য অপেক্ষায় থাকা ৩৩ শিশু মারা গেছে। বুধবার (২৫ মার্চ) সকাল পর্যন্ত আইসিইউ বেডের জন্য ৩৮ শিশু অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল। মূলত আইসিইউ বেডের সংকটে এসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজন ও সংশ্লিষ্টরা।
নগরীর তেরখাদিয়া এলাকার বাসিন্দা সাহিদের শিশুসন্তান নাহিদ ১৩ মার্চ এই হাসপাতালে মারা গেছে। বাবা সাহিদ জানান, আইসিইউতে নেওয়ার জন্য চিকিৎসক পরামর্শ দেওয়ার তিন দিন পর তার ছেলে মারা যায়। এই তিন দিনে চেষ্টা করেও ছেলেকে আইসিইউতে নিতে পারেননি।
রামেক হাসপাতারের আইসিইউর ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, ১২ শয্যার শিশু আইসিইউতে কেউ মারা না গেলে সাধারণত খালি হয় না। কোনও শিশু মারা গেলে বেড ফাঁকা হয়। তখন অপেক্ষমাণ থাকা তালিকা ধরে ফোন করা হয়। এভাবে অপেক্ষায় থেকে আইসিইউ না পেয়ে গত আড়াই মাসে ৫৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ১১ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যেই আইসিইউতে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা ২৮ শিশু মারা গেছে। আর ভর্তির পর মারা গেছে আরও নয় শিশু।
চিকিৎসকরা বলছেন, নিউমোনিয়ার পাশাপাশি হাম মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অভিভাবকরা শিশুদের টিকার ডোজ সম্পন্ন করছেন না। এ কারণে হাম হচ্ছে বেশি। হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে উদ্বেগজনকও বলছেন তারা।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের নিয়মিত টিকা কার্যক্রম চলমান। কিন্তু কী কারণে হাম বাড়ল তা বলা যাচ্ছে না। তবে সারাদেশে শিগগিরই টিকা ক্যাম্পেইন করা হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর উদ্যোগ নেবে।’
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিনই নেমে আসে শোকের ছায়া। কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে করিডর আর অসহায় দৃষ্টিতে সন্তানের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে বসে থাকেন বাবা-মা। গত আড়াই মাসে আইসিইউ সুবিধা না পেয়ে একের পর এক শিশু মারা গেছে। অন্যদিকে আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি আরও নয়টি শিশুকে। সব মিলিয়ে ৬২টি শিশুর প্রাণহানির এই পরিসংখ্যান শুধু একটি হাসপাতালের নয়, এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক গভীর সংকটের যেন প্রতিচ্ছবি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত শিশুদের বেশির ভাগই ছিল নিউমোনিয়া ও হাম আক্রান্ত। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী এসব রোগের জটিলতা বাড়লে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়; কিন্তু রামেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য আইসিইউ নেই। তবে স্থানীয়ভাবে সাধারণ আইসিইউর ১২টি বেড শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে। ফলে বেড খালি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি বেডে একাধিক রোগী, কোথাও মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা। অক্সিজেনের জন্য অপেক্ষা। এক বেডে ২/৩ জন করে শিশু রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর স্বজনদের ঠাসাঠাসি আর গাদাগাদি। নার্সদের ব্যস্ততা আর স্বজনদের উৎকণ্ঠা সব মিলিয়ে এক চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে ওয়ার্ডজুড়ে।
শিশুর বাবা-মায়েরা অভিযোগ করছেন, সময়মতো আইসিইউ-সুবিধা পেলে হয়তো তাদের সন্তানদের বাঁচানো যেতো। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার তরিকুল ইসলাম জানান, তার ছয় মাসের শিশু রিদুয়ান হাম আক্রান্ত ছিল। হাসপাতালে ভর্তির পর অবস্থা আরও জটিল হয়; কিন্তু অপেক্ষায় থেকে থেকে আইসিইউ পাননি। গত ১৮ মার্চ শিশুটি মারা যায়। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার শাহীন হোসেনের ১০ মাস বয়সী শিশু জিহাদ শিশু ওয়ার্ডে (২৪ নম্বর) ভর্তি ছিল। সেও হামে আক্রান্ত। তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসক; কিন্তু সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করে করে শিশুটির জন্য আইসিইউ পাওয়া যায়নি। অবশেষে ১৮ মার্চ দুপুরে জিহাদ মারা যায়। শাহীন বলেন, ‘আইসিইউ পেলে হয়তো আমার বাচ্চাটি বেঁচে যেতো।’
পুঠিয়ার বানেশ্বর থেকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক শিশুর মা সালেহা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ডা. বলেছিল আইসিইউ লাগবে; কিন্তু বেড খালি নেই। ঈদ কাটলো আইসিইউর সামনে অপেক্ষা করে করে।
গোদাগাড়ী থেকে আসা এক শিশুর বাবা জানান, তার বাচ্চা তিন মাস ধরে অসুস্থ। জ্বর, কাশি আর হাম। বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। কিন্তু কোনও উন্নতি হচ্ছে না।
চিকিৎসকরা বলছেন, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও হাম রোগের প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষ করে যারা টিকা থেকে বঞ্চিত, তাদের ঝুঁকি বেশি। হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও টিকাদানে ঘাটতি থাকায় অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসছে। তখন তাদের বাঁচাতে প্রয়োজন হয় উন্নত চিকিৎসা সুবিধা, বিশেষ করে আইসিইউ।
রামেক হাসপাতালের আইসিইউর ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘১৯ মার্চ সকালে একটি শিশু মারা গেছে। সে অপেক্ষমাণ তালিকার ৩৭ নম্বরে ছিল। তার মা কাঁদতে কাঁদতে মোবাইলে বলেছিল, এত জায়গা থেকে তদবির করালাম, তবু আমার বাচ্চাকে আইসিইউ বেড দিলেন না, বেড পেলে বাচ্চাটা বাঁচতো।’
অভিভাবকদের কাছ থেকে প্রায়ই ফোনে এ রকম ‘অভিশাপ’ পেতে হচ্ছে মন্তব্য করে আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের সরকারি হাসপাতালের মধ্যে একমাত্র রাজশাহীর এই ডেডিকেটেড ১২ শয্যার শিশু আইসিইউ। তা-ও চলছে বিশেষ ব্যবস্থায়। ১৯ মার্চ সর্বশেষ সিরিয়ালের রোগীর ঠিকানা ছিল রাজবাড়ী। তার মানে ঢাকা বিভাগের রোগীও একটা আইসিইউ শয্যার জন্য এখানে চলে আসছে।’
জটিল, সংকটাপন্ন ও মুমূর্ষু রোগীদের আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ বিশেষায়িত আইসিইউ সেবার খরচ তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি পর্যায়ের খরচ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। সরকারি ও বেসরকারি আইসিইউ সহজে পাওয়া যায় না।
২০২৪ সালের জুনে স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রকাশিত ‘হেলথ বুলেটিন ২০২৩’ অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে সরকারি উদ্যোগে মোট ৭২৮টি নতুন আইসিইউ শয্যা স্থাপন করা হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে আইসিইউ-সম্পর্কিত সর্বশেষ তথ্য এটি। যদিও দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় মোট আইসিইউ শয্যা কতটি, তা ওই বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়নি।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ৬০ শয্যাবিশিষ্ট দেশের বৃহত্তম আইসিইউ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শয্যা ৪০ ও শিশুদের ২০টি। কিন্তু এটি সরকারের অনুমোদন পায়নি। চলছে হাসপাতালের নিজস্ব উদ্যোগে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থায় প্রাপ্তবয়স্কদের ৪০টি শয্যার মধ্যে যুবকদের ১২টি, বয়স্কদের জন্য ১৬ ও ১২টি শয্যা শিশুদের জন্য ব্যবহার করছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল সরবরাহ না করায় শিশুদের ২০টি শয্যা চালু করা যাচ্ছে না। কিন্তু শিশুদের আইসিইউর চাহিদা অনেক বেশি।
রামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম বলেন, ‘রাজশাহী মেডিক্যালে বর্তমানে ৪০ শয্যার যে আইসিইউ চলছে, সেটা সরকার অনুমোদিত নয়। সম্পূর্ণ হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলে এটি। এখানে সরকার একজনকেও নিয়োগ দেয়নি।’
এদিকে রাজশাহী নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় ২০০ শয্যার একটি শিশু হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ১০ শয্যার শিশুদের আইসিইউ আছে। ২০২৩ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলেও কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি হস্তান্তরই করেনি, জনবল কাঠামো অনুমোদন হয়নি।
আইসিইউর ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, রাজশাহীতে শিশু হাসপাতাল বিল্ডিং, শিশু আইসিইউর অবকাঠামো সব তৈরি হয়ে আছে। শুধু দরকার সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সদিচ্ছা।
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
স্বত্ব ©Rajshahi Mail