রাজশাহীতে অভিযোগ পেয়ে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে সেই অভিযোগের কথা বলে ১০ লাখ টাকার বাণিজ্যে নেমেছিলেন নগরের একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), পরিদর্শক (তদন্ত), ওসির গাড়িচালকসহ তিন কনস্টেবল। জানাজানির পর ঘটনা অনুসন্ধানে নামে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় অভিযুক্ত তিন কনস্টেবলকে থানা থেকে প্রত্যাহারের পাশাপাশি ওসি ও পরিদর্শককে অন্য দুই থানায় বদলি করা হয়।
অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা হলেন নগরের কাশিয়াডাঙ্গা থানার তৎকালীন ওসি আজিজুল বারী, পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল আজিজ মণ্ডল, ওসির গাড়িচালক কনস্টেবল সোহেল রানা, কনস্টেবল মো. মাহবুব ও কনস্টেবল মো. সাইফুজ্জামান। এর মধ্যে ইউনিফর্ম পরে স্ত্রী টিকটক ভিডিও করায় সাইফুজ্জামানকে প্রত্যাহার করা হয়। অভিযোগ ভাঙিয়ে টাকা আদায়ের ঘটনায় এক কনস্টেবলের স্ত্রী, কথিত এক ব্যবসায়ী ও তাঁর স্ত্রী জড়িত বলে অভিযোগ। ঘটনাটি এখন মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অতিরিক্ত উপকমিশনার হাফিজুর রহমান অনুসন্ধান করছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর কথিত এক ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠক পরিচয় দিয়ে জনৈক ব্যক্তি গত ২৬ নভেম্বর কাশিয়াডাঙ্গা থানা এলাকার একটি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের পরিচালকের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ করেন। এতে ওই পরিচালকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানিসহ কিছু অভিযোগ করা হয়। কিন্তু অভিযোগ পেয়ে পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে তাঁর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা আদায়ে মরিয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ।
ওই প্রশিক্ষণকেন্দ্রের পরিচালক মারুফ হোসেন জানান, গত ১ সেপ্টেম্বর প্রশিক্ষণকেন্দ্রের উদ্বোধনের জন্য তিনি কাশিয়াডাঙ্গা থানার তৎকালীন ওসি আজিজুল বারীকে প্রধান অতিথি করেন। এর কয়েক দিন পর তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে জানিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে থানা-পুলিশ। কী অভিযোগ তা না জানিয়ে মীমাংসার জন্য ১০ লাখ টাকা দিতে চাপ দেয়।
মারুফ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, কাশিয়াডাঙ্গা থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল আজিজ মণ্ডল, ওসির গাড়িচালক সোহেল রানা ও কনস্টেবল মো. মাহবুব ১০ লাখ টাকার জন্য তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে বারবার ফোন দিতে থাকেন। এর মধ্যে সিমা খাতুন নামের প্রশিক্ষণকেন্দ্রের এক প্রশিক্ষণার্থী তাঁকে মেসেঞ্জারে বলেন, ‘তাদের কাছে তেমন কোনো প্রমাণ নেই। তারা ৫ লাখ টাকা চায়।’ এই সিমার স্বামী সাইফুজ্জামানও ওই থানার কনস্টেবল ছিলেন।
পুলিশ পরিদর্শক আজিজ মণ্ডল টাকার জন্য মারুফকে চাপ দিচ্ছেন, এমন কল রেকর্ড পাওয়া গেছে। আজিজ মণ্ডল হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করলেও মারুফ অন্য মোবাইল দিয়ে সেটি ভিডিও করে রেখেছিলেন। ওই ভিডিওতে শোনা যাচ্ছে, আজিজ মণ্ডল মারুফকে দেখা করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। অভিযোগকারীর সঙ্গে বসে মীমাংসা করার জন্য বলছেন। অন্যদিকে মারুফ তাঁকে বলছেন, যে অ্যামাউন্টের কথা বলা হয়েছে, তা ম্যানেজ করতে না পারায় দেখা করতে পারছেন না।
শুধু আজিজ মণ্ডল নন, কনস্টেবল মাহবুব ও ওসির গাড়িচালক সোহেলও টাকার জন্য ফোন করতে থাকেন মারুফকে। সোহেল রানা ফোন করে বলেন, তিনি ওসির গাড়িচালক। তাঁর কথা মানেই ওসির কথা। এমন পরিস্থিতিতে মারুফ একাধিকবার ওসি আজিজুল বারীর সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু ওসি তাঁর সঙ্গে কোনো কথা না বলে পরিদর্শক (তদন্ত) ও দুই কনস্টেবলের সঙ্গে আগে কথা বলার পরামর্শ দেন। একপর্যায়ে ৭ ডিসেম্বর মাহবুব ও সোহেল তাঁর সঙ্গে দেখা করে ১০ হাজার টাকা নিয়ে যান। মারুফ দূর থেকে এর ভিডিও করে রাখেন।
বিজ্ঞাপন
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এসব প্রমাণ পাওয়ার পর অনুসন্ধানে নামে। দুই কনস্টেবল টাকা নেওয়ার পরই তড়িঘড়ি করে তাঁদের কাশিয়াডাঙ্গা থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। এ ঘটনার পর পুলিশের পোশাক পরে কনস্টেবল সাইফুজ্জামানের স্ত্রী সিমা খাতুনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে গত বৃহস্পতিবার সাইফুজ্জামানকেও প্রত্যাহার করা হয়।
ভুক্তভোগী মারুফ হোসেন বলেন, প্রকৃতপক্ষে তাঁর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে ‘মিথ্যা’ অভিযোগ করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, টাকা আদায়ের চেষ্টার সঙ্গে তৎকালীন ওসি আজিজুল বারী যুক্ত ছিলেন। তিনি বারবার পরিদর্শক (তদন্ত) ও কনস্টেবলদের সঙ্গেই কথা বলতে বলেছিলেন। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁকে ডেকে ঘটনা জানার পর দুই কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু ওসি ও পরিদর্শকের (তদন্তের) বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁদের শুধু বদলি করা হয়েছে।
থানায় অভিযোগকারী নিজেকে ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠক পরিচয় দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ‘আমার অভিযোগ মিথ্যা না। আমি এ চক্রে জড়িতও নই। আমি অভিযোগ করার পরে ২০ ডিসেম্বর জানতে পারি যে আমার অভিযোগ নিয়ে এত কিছু ঘটে গেছে।’
কাশিয়াডাঙ্গা থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল আজিজ মণ্ডল এখন নগরের কর্ণহার থানায় আছেন। যোগাযোগ করলে তিনি টাকা চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। কল রেকর্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে কথা বলতে চাই না। এগুলো আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখছে। তাঁদের বলব।’
ওসি আজিজুল বারী এখন আছেন আরএমপির দামকুড়া থানায়। তিনি দাবি করেন, এ ঘটনার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন না। তাঁর নাম ভাঙিয়ে কেউ টাকা আদায়ের চেষ্টা করলে দায়ভার তাঁদের। ইতিমধ্যে এ অভিযোগে দুজন কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গাজিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে, তাঁদের ইতিমধ্যে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত শেষে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি অনুসন্ধান করছেন।
সূত্র প্রথম আলো
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
স্বত্ব ©Rajshahi Mail