ঢাকাবুধবার , ৭ জানুয়ারি ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আট বছরে রাজশাহীতে কমেছে ১৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমি

Rajshahi Samachar
জানুয়ারি ৭, ২০২৬ ১১:০৯ অপরাহ্ণ । ৯৫ জন
ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহীতে তিন ফসলি উর্বর জমি কেটে চলছে পুকুর খননের মহোৎসব। কৃষিজমি কেটে বানানো হচ্ছে বড় বড় পুকুর। এসব পুকুরে করা হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ।

এসব পুকুর কাটার ফলে আশপাশের এলাকায় তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন। পুকুর কেটে মাছচাষের কারণে ক্ষতি হচ্ছে মাটির উর্বরা শক্তির।

কৃষকরা বলছেন, রাজশাহীর দুর্গাপুর, পুঠিয়া, বাগমারা, মোহনপুর, পবা, তানোর ও গোদাগাড়ী এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে উর্বর ফসলি জমি কেটে পুকুর খনন চলছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভূমিদস্যুরা এসব উর্বর জমিতে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে। প্রশাসন থেকে মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান হলেও বন্ধ হচ্ছে না পুকুর আগ্রাসন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গত আট বছরে রাজশাহী জেলায় ১৬ হাজার ১৫৯ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে নির্বিচার পুকুর কাটার কারণে। আর এ সময়ের মধ্যে জেলায় বেড়েছে পুকুরের সংখ্যাও।

একই সঙ্গে ফসলি জমিতে গড়ে উঠছে আবাসিক ভবন, অবৈধ ইটভাটা, রাস্তাঘাট এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ফলে কৃষিকাজের বিশাল ক্ষেত্র স্থায়ীভাবে ধ্বংস হচ্ছে।

দেশের অন্যতম শস্যভাণ্ডার রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল হয়ে পড়ছে কৃষিশূন্য। এ সংকট তীব্র হচ্ছে দিনদিন। বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি নষ্ট হওয়ায় অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন ও চাহিদায় ফারাক তৈরি হয়েছে গত এক দশকে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, রাজশাহীতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ জলাভূমির বা পুকুরের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার ৪৯৮ হেক্টর। অথচ ২০১৫ সালে জলাভূমি ও পুকুরের আয়তন ছিল ১৫ হাজার ৪৪ হেক্টর। আগে রাজশাহীতে প্রাকৃতিক জলাধার ছিল মাত্র ৬ হাজার ৩৫৬ হেক্টর। গত আট বছরে শুধু পুকুর খননের কারণে রাজশাহীর ৯ হাজার ৪৫৪ হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে।

এর বাইরে ফসলি জমিতে গড়ে উঠা অবৈধ ইটভাটা, জমি নষ্ট করে আবাসন তৈরি ও শিল্প কারখানা এবং সড়ক অবকাঠামো তৈরিতে এ সময়ে আরও ৬ হাজার ৭০৫ হেক্টর কৃষিজমি কমেছে।

রাজশাহী জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৭৮৮টি। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ২৭৫টিতে। যা এক দশকে প্রায় ২৮ শতাংশ পুকুর জলাশয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি এই হিসাবের বাইরেও আরও বেশি পুকুর খনন চলছে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায়।

মৎস্য দপ্তরের হিসাব মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহীতে ৮৪ হাজার ৮০৩ টন চাষের মাছ উৎপাদন হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা ছিল ৫২ হাজার ৬৩ টন। বাকি মাছ দেশের বিভিন্ন জেলায় চালান করা হয়েছে।

রাজশাহীর দুর্গাপুর এলাকার কৃষকেরা জানিয়েছেন, পুকুর খননের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠছে এলাকায় এলাকায়। মাঝেমধ্যে তা সহিংস হয়ে উঠছে। গত ১৭ ডিসেম্বর মোহনপুর উপজেলার বারো পালশা গ্রামের কৃষক জুবায়ের আহমেদ (২৭) মধ্যরাতে অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সময় ভূমিদস্যুদের খনন যন্ত্রের আঘাতে নিহত হন। এর মামলা হলেও প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এছাড়াও রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় পুকুর খনন করার জন্য এক্সকেভেটর জব্দ ও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কৃষকেরা প্রতিবাদী হয়ে উঠলে তখন স্থানীয় প্রশাসন লোক দেখানো অভিযানে নামছে; কিন্তু তাতে পুকুর খনন বন্ধ হচ্ছে না।

রাজশাহী জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং মাঠের কৃষকেরা জানান, রাজশাহীজুড়ে হারিয়ে যাওয়া উচ্চ-ফলনশীল আবাদযোগ্য জমির বেশিরভাগই বাণিজ্যিক মাছের পুকুরে রূপান্তরিত করা হয়েছে; যা মাটি সংরক্ষণ নির্দেশিকা এবং কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১৮ লঙ্ঘন করে করা হচ্ছে।

তবে কৃষক এবং বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পুকুরের পেটে যাওয়া জমির প্রকৃত পরিমাণ অনেক বেশি। রাজশাহীতে বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত এবং অবৈধ পুকুর রয়েছে। রয়েছে শতাধিক অবৈধ ইটভাটা।

মোহনপুরের বিদিরপুর এলাকার কৃষক মমিন প্রামাণিক অভিযোগে বলেন, প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড চলছে।

রাজশাহীর পবা উপজেলার একাধিক কৃষক ও জমির মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিক মুনাফার লোভে রাজশাহীজুড়ে ফসলি জমিতে পুকুর করা হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে মাছচাষ ধানসহ অন্যান্য ফসল আবাদের তুলনায় লাভজনক। কয়েক লাখ টাকা খরচ করে একবার পুকুর খনন করা হলে তাতে ১০ থেকে ১২ বছর ধরে মাছ চাষ করা যায়। ফসল ফলানোর চেয়ে মাছ চাষের খরচ কম আবার লাভও বেশি। প্রভাবশালীরা পুকুর খননে সহায়তা করছে। এই সিন্ডিকেটে যেমন উপজেলা প্রশাসন আছে তেমনি আছে থানা পুলিশও। আর রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের কাছে পুকুর কাটার দালালি একটি অতি লাভজনক ব্যবসাতে পরিণত হয়েছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফুলবাড়ি গ্রামের কৃষক সৈয়দ হোসেন জানান, তিন বিঘা জমিতে ধান থেকে বছরে ৪০ হাজার টাকা আয় হয়; কিন্তু একই পরিমাণ জমি বাণিজ্যিক পুকুরের জন্য লিজ দিলে বছরে ৮০ হাজার টাকা আয় হয়। চাষাবাদ করে দাম না পেলে পুরো টাকা ক্ষতি হয়ে যায়; কিন্তু পুকুর হিসেবে লিজ দিলে তা আর ক্ষতি থাকে না। এভাবেই অনেক কৃষক আবার পুকুর কাটতে ভূমিদস্যুদের কাছে জমি লিজ দিয়ে দিচ্ছেন।

জানা গেছে, ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী কোথাও পুকুর বা জলাশয় খনন করতে হলে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়। ইটভাটা করতে গেলেও উপজেলা প্রশাসনের অনুমোদন লাগে। তবে এসব নিয়মকানুন অনুসরণ না করেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুকুর খনন হচ্ছে রাতের আঁধারে এবং অবৈধভাবে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাটোর, নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবৈধ পুকুর খনন বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজশাহীতেও ধারাবাহিকভাবে পুকুর খনন হচ্ছে। রাজশাহীর মাছ ব্যবসায়ীরা পাশের জেলাগুলোতে এখন গিয়ে পুকুর খনন করছেন। সেখানে জমির ইজারা খরচ অনেক কম।

তিনি বলেন, রাজশাহী অঞ্চলে প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা বেশি। যদি বিলের মাঝখানে পুকুর খনন করা হয়, তাহলে আশপাশের খেত জলমগ্ন হয়ে যায়। চাষাবাদও অসম্ভব হয়ে পড়ে। এগুলো প্রতিরোধ করতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকে। কৃষি বিভাগের হাতে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বিচারে পুকুর খননের ফলে উর্বর মাটির উপরের অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জমিতে অনূর্বর মাটি ছড়িয়ে পড়ছে। জমি চাষের জন্য অনুপযুক্তও হয়ে পড়ছে। অপরিকল্পিত খনন প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থাকেও ব্যাহত করছে। মাইক্রোক্লাইমেট পরিবর্তন করছে এবং বিভিন্ন ধরনের রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার বলেন, কৃষি ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত উপজেলা পর্যায়ের কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুকুর খননের অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে অবৈধভাবে কোনো অনুমতি ছাড়াই পুকুর খনন হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। অবৈধ পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং রাতের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র:যুগান্তর