ঢাকাশনিবার , ২৮ মার্চ ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্বপ্ন ভেঙে দিল দুর্ঘটনা, শোকে ডুবল দেশ

Rajshahi Samachar
মার্চ ২৮, ২০২৬ ৯:৩৫ অপরাহ্ণ । ৫৫ জন

ঈদের আনন্দযাত্রা প্রতি বছরই যেন রূপ নেয় শোকের মিছিলে। এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘিরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং সামগ্রিক পরিসংখ্যান ও কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও উদ্বেগজনক।

সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনে দেশে ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৭৪ জন। আহত হয়েছেন আরও অসংখ্য মানুষ। গত বছরের তুলনায় এ সংখ্যা বেশি, যেখানে ২০২৪ সালের ঈদে ১১ দিনে নিহত হয়েছিলেন ২৪৯ জন।

এই পরিসংখ্যানের মধ্যেই বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে তিনটি বড় দুর্ঘটনা, যা নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে।

ঈদের আগে বুধবার (১৮ মার্চ) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ১৪ নম্বর পন্টুনের কাছে ঢাকা–ইলিশা রুটের ‘আসা যাওয়া-৫’ লঞ্চে যাত্রী ওঠানামার সময় ঢাকা-দেউলা-ঘোষেরহাট রুটের ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ সেটিকে ধাক্কা দেয়। এই সংঘর্ষে মো. সোহেল (২২) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়। তার বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ধাক্কার ফলে দুই যাত্রী গুরুতরভাবে আহত হন—একজন নদীতে পড়ে যান, আরেকজন লঞ্চের বাইরে পড়ে থাকেন।

২১ মার্চ দিবাগত রাতে কুমিল্লায় ঘটে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনা। একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান,শনিবার ঈদের নামাজ শেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর এলাকায় স্বজনদের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা করেন একদল মানুষ। মামুন স্পেশাল নামের যাত্রীবাহী বাসটি রাত তিনটার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় পৌঁছায়। বাসের প্রতিটি যাত্রী সে সময় ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল। বাসটি পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিং উন্মুক্ত দেখে সোজা রেললাইনের ওপরে উঠে পড়ে। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের মুখে পড়ে বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। বাসটিকে মুখে নিয়ে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ট্রেনটি নিয়ন্ত্রণে আসে। বাসযাত্রীদের চিৎকার ও আর্তনাদ শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করে। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত হন।

ঈদে বাড়ি ফেরার তাড়াহুড়ো, চালকদের সময়ের চাপ এবং রেলপথে নিরাপত্তার দুর্বলতা -সব মিলিয়ে এই দুর্ঘটনা হয়ে ওঠে একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রথম দুর্ঘটনার শোক কাটতে না কাটতেই ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। এতে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়।

ঘটনার পরপরই শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে নদী থেকে একে একে উদ্ধার করা হয় মরদেহ। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে ঘাট এলাকা। এমন দৃশ্য যেন পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়।

এই বড় দুটি দুর্ঘটনা ভিন্ন স্থানে ঘটলেও তাদের পেছনের বাস্তবতা এক নিরাপত্তাহীন পরিবহন ব্যবস্থা। কোথাও রেলক্রসিংয়ে পর্যাপ্ত সতর্কতা নেই, কোথাও যানবাহনের ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন, আবার কোথাও চালকের দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শঙ্কা।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ৭ দিনে ৯২টি দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন। তবে বেসরকারি সংস্থার হিসাবের সঙ্গে এই তথ্যের পার্থক্য দেখাচ্ছে, প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে।

পুলিশের গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশই ঘটে বেপরোয়া গতির কারণে। এছাড়া ঈদের সময় সড়কে অতিরিক্ত চাপ, দীর্ঘ যাত্রায় ক্লান্ত চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অনভিজ্ঞ চালকদের উপস্থিতি ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। ঈদের সময় এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করে, ফলে দুর্ঘটনার মাত্রা বেড়ে যায় বহুগুণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা নতুন নয় -সমাধানের অভাবই বড় সমস্যা। ঈদকে সামনে রেখে কিছু সাময়িক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর বা টেকসই নয়।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের মতে, এবারের দুর্ঘটনার সংখ্যাই প্রমাণ করে সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। বাস্তবে যেটুকু ব্যবস্থাপনা ছিল, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে ভেঙে পড়েছে।

এই ২৭৪ জনেরই ছিলো একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি ভবিষ্যৎ। যারা ফিরছিলেন ঈদের আনন্দ নিয়ে, তাদের অনেকেই আর পৌঁছাতে পারেননি গন্তব্যে। কুমিল্লার রেলক্রসিং হোক বা দৌলতদিয়ার নদীঘাট সবখানেই একই চিত্র, একই প্রশ্ন: নিরাপদ যাত্রা কি এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি ? প্রতি বছর যদি এই উৎসবের সঙ্গে মৃত্যু আর শোক জড়িয়ে থাকে, তবে তা আর কেবল দুর্ঘটনা থাকে না, এটি হয়ে যায় একটি চলমান সংকট।

সংখ্যা বাড়ছে, শোক বাড়ছে, কিন্তু ব্যবস্থা কি বদলাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি। না হলে আগামী ঈদেও হয়তো আবারও লিখতে হবে একই গল্প।

আবু রায়হান, গণমাধ্যম কর্মী