ঢাকাশুক্রবার , ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চায়না মাছ ধরা ফাঁদ হানি ট্রাপে বিপর্যয় জলাভূমির প্রাণবৈচিত্র্য

Rajshahi Samachar
ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬ ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ । ৮৩ জন
ছবি: সংগৃহীত

চায়না মাছ ধরা ফাঁদ হানি ট্রাপে বিপর্যয় জলাভূমির প্রাণবৈচিত্র্যঃ
চায়না মাছ ধরার ফাঁদ ও হানিট্রাপ ব্যবহারের কারনে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের জলাভূমির প্রাণবৈচিত্র্য মারাত্বক হুমকিতে। সংবাদ সম্মেলনে উদ্বেগ ও জরুরি নীতিগত পদক্ষেপের দাবি।

সোমবার রাজশাহী এসকে সেমিনার হলে বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার, গ্রিন কোয়ালিশন-রাজশাহী ও বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম-এর উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের অভ্যন্তরীণ জলাভূমিতে চায়না থেকে আমদানি করা মাছ ধরার ফাঁদ, কৃত্রিম হানি ট্র্যাপ ও রাসায়নিক আকর্ষণকারীর ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রাজশাহীর পদ্মা নদীসহ আশপাশের নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার নদী, বিল, খাল ও মৌসুমি জলাশয়ে নির্বিচারে ব্যবহৃত চায়না দুয়ারী জাল, ছাতা জাল, মোনোফিলামেন্ট-কারেন্ট জাল। একইসাথে দিনে দিনে প্রযুক্তি নির্ভর লেড লাইট, রাসায়নিক হানি ট্র্যাপ ও ইলেকট্রিক ফিশিং ডিভাইস মাছ ধরার কাজে ব্যবহার হচ্ছে দেশের নদী ও জলাভূমিতে। অন্যদিকে দ্রæত মাছে বৃদ্ধিতে হরমোনাল ইনজেকশন, মাছকে বন্ধ্যাত্বকরন ট্যাবেলেটও ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে জলজ প্রাণীর প্রজনন ব্যবস্থা ধ্বংস করছে। ফলস্বরুপ দেশি মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও সামগ্রিক প্রাণবৈচিত্র্য দ্রত হ্রাস পাচ্ছে এবং জেলে ও জলাভূমি নির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকা চরম ঝুঁকিতে পড়ছে। সংবাদ সম্মেলনে পবা উপজেলার বারনই নদী পাড়ের মৎচাষী আবু সামা বলেন- দুয়ারি জাল ব্যবহারসহ মাছ বৃদ্ধির জন্য হরমোনাল ইনজেকশন এবং বন্ধ্যাত্বকরণ ট্যাবলেট খাওয়ানো হয় মাছকে। তিনি আরো বলেন- পুকুরে এসব ব্যবহার করলেও বৃষ্টি এবং বন্যার কারনে তা মুক্ত জলাশয়ে যায়। এর ফলে অন্যান্য জলজপ্রাণীর উপরও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিলে, নদীতে আগে মতো আর দেশি মাছ পাওয়া যায়না।

বারসিক-এর নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়ক মো. শহিদুল ইসলাম পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে জানান- সাম্প্রতিক মাঠ গবেষণা ও নৃবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে এই প্রযুক্তিগুলো স্বল্পমেয়াদে কিছু জেলের আয় বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে জলাশয়কে কার্যত “মৃত” করে দিচ্ছে। রাসায়নিক হানি ট্র্যাপে ব্যবহৃত উপাদান জলাশয়ে জমে থেকে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি আরো বলেন- এসব নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি এবং মাছ শিকার করার রাসায়নিক হানিট্রাপ নির্বিচারে অনলাইন সপে বিক্রি হচ্ছে এবং এর বেশির ভাগই চায়না থেকে অবাধে দেশে আনা ও বিক্রি করা হচ্ছে। দেশের মৎস সুরক্ষা আইন,১৯৫০, পরিবেশ সুরক্ষা আইনে এসব বিষয়ে নিষিদ্ধের কথা বলা থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়না। যার ফলে অবাধে এসব পণ্য দেশে ভেতরে আমদানি বা অবৈধ পথে প্রবেশ করছে। সংবাদ সম্মেলনে বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম-এর সভপতি আতিকুর রহমান আতিক বলেন- এটি শুধু প্রযুক্তির অপব্যবহার নয়; বরং মৎস্য ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত ব্যর্থতা। বিদ্যমান মৎস্য আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন থাকা সত্তেও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ক্ষতিকর এসব ফাঁদ ও রাসায়নিকের আমদানি, বিপণন ও ব্যবহার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেনে মৎসচাষীদের পক্ষ থেকে আবু সামা নিম্নোক্ত দাবি উত্থাপন করেন

১. জলাভূমিতে বিষ, হানি ট্র্যাপ, বৈদ্যুতিক শক ও অবৈধ মাছ ধরার উপকরণ অবিলম্বে নিষিদ্ধ ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
২. চায়না থেকে আমদানি করা হরমোন মাছ শিকার করা বিষ, হানি ট্র্যাপ, বৈদ্যুতিক শক ও অবৈধ মাছ ধরার উপকরণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
৩. বিদ্যমান মৎস্য ও পরিবেশ আইন কার্যকর করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. জলাভূমি ব্যবস্থাপনায় লোকায়ত ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে স্বীকৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৫. জলাভূমিনির্ভর জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
৬. জলাভূমিকে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, মানুষসহ সকল প্রাণের জীবনের অধিকার সম্পর্কিত এলাকা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
৭.অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গুলোতে অবাধে এসব নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি বন্ধে তদারকী এবং বন্ধ করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের জলাভূমি ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হবে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্বক ক্ষতি ডেকে আনবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে।