মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত নওগাঁর আত্রাই উপজেলা। শুঁটকি উৎপাদনেও এই উপজেলার সুনাম রয়েছে। তবে এ বছর অসময়ে বন্যা হওয়ায় দেশীয় মাছের সংকটে শুঁটকির উৎপাদন কমেছে। এ ছাড়া নীলফামারীর সৈয়দপুরে বৃহৎ শুঁটকি মাছের একটিমাত্র মোকাম হওয়ার কারণে আড়তদারদের সিন্ডিকেটে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শুঁটকি ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে ভারতে রফতানি না হওয়ায় কমেছে শুঁটকির দাম। এতে আয়েও ভাটা পড়েছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা। শুঁটকির বাজার এবং ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে এসব ব্যবসায়ীরা স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
জেলার আত্রাই উপজেলায় নদী ও বিলসহ প্রায় শতাধিক জলাশয় রয়েছে। এ উপজেলার আত্রাই নদীর তীরে অবস্থিত ভরতেঁতুলিয়া গ্রাম। প্রতি বছর জলাশয়ের পানি কমে আসলে এ নদীর তীরে শুঁটকি উৎপাদনে ব্যস্ত থাকে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। তবে এ বছর দেশীয় মাছের সংকটে ব্যস্ততা যেমন কমেছে, তেমনি শুঁটকি উৎপাদনও কমেছে। কাঁচা মাছের সংকটে অধিকাংশ চাতাল ফাঁকা পড়ে রয়েছে। তবে এ উপজেলার শুঁটকির কদর রয়েছে দেশজুড়ে। শুধু দেশেই নয়, ভারতের অঙ্গরাজ্য ত্রিপুরায় রয়েছে এখানকার শুঁটকির কদর। এ উপজেলার আহসানগঞ্জে মাছের আড়ত গড়ে উঠেছে। যেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে এ আড়তে মাছ বিক্রি করে চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এখান থেকে কাঁচা মাছ কিনে শুঁটকি উৎপাদন করা হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, এ বছর অসময়ে বন্যা হওয়ায় দেশীয় মাছের উৎপাদন কমেছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর কাঁচা মাছ কেজিতে ৪০-৫০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। প্রতি কেজি কাঁচা মাছ টাকি ২০০ টাকা থেকে ২৫০, খলশে ৭০-৯০ টাকা কেজি, পুঁটি ৬০-১৭০ টাকা এবং চান্দা ৫০-৬০ টাকা। তবে শোল ও বোয়ালসহ অন্যান্য দেশি মাছ না পাওয়ায় শুঁটকি হচ্ছে না। অনেক চাতাল ফাঁকা পড়ে রয়েছে। সাড়ে ৩ কেজি টাকি ও চান্দা মাছ শুকিয়ে ১ কেজি শুঁটকি হয় এবং ৫ কেজি পুঁটি থেকে ১ কেজি শুঁটকি উৎপাদন হয়। প্রতি কেজি টাকি মাছের শুঁটকি ৪০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা, পুঁটি ১৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা ও চান্দা ৩০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।
আত্রাই উপজেলার ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের শুঁটকি ব্যবসায়ী ওসমান শেখ বলেন, গত প্রায় ২০ বছর থেকে শুঁটকি ব্যবসা করছি। এ বছর ১০ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছি। গত বছর থেকে দেশীয় মাছের উৎপাদন কমেছে। এ বছরও কম। দেশীয় মাছের সংকটে প্রতিযোগিতা করে কাঁচা মাছ কেজিতে ৪০-৫০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আবার শুঁটকি উৎপাদন করে মোকামে বিক্রি করে কাক্সিক্ষত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও বছর শেষে সব খরচ বাদে আড়াই লাখ টাকা লাভের আশা করছি, যা দিয়ে চলে সারা বছর ভরণপোষণ।
শুঁটকি ব্যবসায়ী মনজু মোল্লা বলেন, সারা দেশে কম-বেশি শুঁটকির চাহিদা রয়েছে। তবে নীলফামারীর সৈয়দপুরে বৃহৎ শুঁটকি মাছের মোকাম। একটিমাত্র মোকাম হওয়ার কারণে আড়তদারদের সিন্ডিকেটে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। ৪৪ কেজিতে মণ বিক্রি করতে হয়। এ ছাড়া শতকরা ৮ টাকা কমিশন দিতে হয়। এতে প্রতি লাখে ৪ হাজার টাকা কমিশন কেটে নেয় তারা। তাদের সিন্ডিকেটের কারণে লাভের পরিমাণ কম আসে। তবে ভারতে শুঁটকি রফতানি শুরু হলে দাম আরও বাড়তি হবে।
শ্রমিক আলতাফ হোসেন বলেন, মহাজনরা আড়ত থেকে দেশীয় প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করে। এরপর আমরা আত্রাই নদীর পানিতে পরিষ্কারের পর লবণ দিয়ে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করি। মাছ পরিষ্কারের কাজে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫০-৬০ জনের। বছরে প্রায় ৬ মাস কাজ হবে। এরপর অন্য কাজ করা হয়।
এ বিষয়ে নওগাঁর আত্রাই উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, এ উপজেলায় ২৬ জন ব্যবসায়ী শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত।
এ ছাড়া আরও শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ বছর অসময়ে বন্যা হওয়ায় দেশীয় মাছের উৎপাদন কিছুটা কমেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় বাজার গড়ে উঠায় মাছগুলো বিভিন্ন এলাকায় চলে যাচ্ছে। এতে শুঁটকি ব্যবসায়ীরা তাদের প্রয়োজনমতো কাঁচা মাছ সংগ্রহ করতে পারছে না। তবে এ বছর ২০০ টন শুঁটকি উৎপাদনের আশা। যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা।








