ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১২ মার্চ ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নির্ভয়া পুরস্কার: ৫ নির্ভীক নারীর অনুপ্রেরণামূলক গল্প

Rajshahi Samachar
মার্চ ১২, ২০২৬ ৫:০০ পূর্বাহ্ণ । ১১৮ জন

মাত্র এক বছর বয়সে বাবাকে হারান। বয়স ১৩ হতেই তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। সেই স্বামীও কয়েক বছর পর তাকে ছেড়ে চলে গেলে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দুই সন্তান নিয়ে জীবনযুদ্ধে নামতে হয় আসমা বেগমের।

বেঁচে থাকার জন্য আসমা মাটি কাটা, কাঠ চেরার মতো কঠোর পরিশ্রমের কাজ বেছে নেন।

‘আমি সবকিছু করছি। রাস্তার ফলপাতা টোকায়ে খেয়েছি, নদীর থেকে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করছি, মধ্যবিত্তদের কাছে জামা-কাপড় চাইয়া পিনছি,’ বলেন আসমা। তার কাঁপা কাঁপা কণ্ঠেও ছিল ইস্পাতসম দৃঢ়তা।

পিরোজপুরের সেই অসহায় নারী আসমা—আজ একজন সফল উদ্যোক্তা। সেই সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিজের সম্প্রদায়ের। সম্প্রতি স্থানীয় একটি সড়ক মেরামতের উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

এখন গ্রামবাসীরা তাকে একজন নেতা হিসেবেই মানেন। অনেকেই তাকে সামনের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহ দিচ্ছেন।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনে এক অনুষ্ঠানে আসমাসহ এমন পাঁচ নারীর অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প তুলে ধরা হয়। তিনিসহ আরও চারজন পরিবর্তক নারী ভূষিত হন ‘নির্ভয়া’ (দ্য ফিয়ারলেস) পুরস্কারে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে অসাধারণ সাহস ও নেতৃত্ব দেখানো নারীদের সম্মান জানাতে ইউএনডিপি বাংলাদেশ এবং দ্য ডেইলি স্টারের যৌথ উদ্যোগে দেওয়া হয় এ পুরস্কার।

ষষ্ঠবারের মতো এ আয়োজনে তুলে ধরা হয়েছে সেসব নারীদের—যারা নিজেদের কাজের মাধ্যমে সম্প্রদায়ে অর্থবহ পরিবর্তন এনেছেন। উদযাপন করা হয়েছে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও সংগ্রামকে জয়ে রূপান্তরিত করা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের অদম্য গল্পগুলোকে।

২০২৬ সালের নির্ভয়া পুরস্কারপ্রাপ্ত এ নারীরা সাহসিকতার বৈচিত্র্যময় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আসমার সঙ্গে এবার এ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন নিজের এলাকায় বাল্যবিবাহ ও হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ বান্দরবানের যতিলা রানী শীল; লিঙ্গগত বাধা ভেঙে তার গ্রামে প্রথম নারী হিসেবে সরাসরি স্থানীয় বাজারে কৃষিপণ্য বিক্রি শুরু করা খুলনার কঙ্কলতা মণ্ডল; পেঁপে চাষের মাধ্যমে নিজের জীবনের গল্প বদলে দেওয়া রাঙামাটির খুশি চাকমা এবং গ্রাম আদালতের মাধ্যমে আদিবাসী নারীদের আইনি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শেরপুরের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ত্রিনালম রং।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম জানান, শিক্ষিত পরিবারেও সূক্ষ্মভাবে লিঙ্গবৈষম্য টিকে আছে। নিজের মেয়ে জন্মানোর সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘তখন আত্মীয়রা দেখতে এসে বলতে শুরু করল, এত সুন্দর বাচ্চা, জামাই খুঁজতে তো অনেক অসুবিধা হবে। অথচ আমার ভাইদের যখন ছেলে সন্তান হচ্ছিল তখন এই আত্মীয়রা সবাই দেখতে গিয়ে বলেছিল, দোয়া করি এই ছেলে বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে, ডাক্তার হবে, ডিপ্লোমেট হবে, আইনজীবী হবে।’

মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমি আপনাদের সবাইকে মন থেকে অভিনন্দন জানাই। আপনাদের সামনে আমি যখন দাঁড়াই, নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়।’

‘আপনারা এত বড়, সত্যিকার অর্থে বড়। আপনারা দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজের বিরুদ্ধে, সংস্কারের বিরুদ্ধে, মূল্যবোধের বিরুদ্ধে, সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এগোতে হয়,’ বলেন তিনি।

গত ৬ বছরে নির্ভয়া পুরস্কারপ্রাপ্ত ৩০ জন নারীর অগ্রগতি অনুসরণ করার জন্য একটি ফলো-আপ কর্মসূচি চালুর প্রস্তাবও দেন তিনি।

ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলারও একই মত প্রকাশ করেন।

পুরস্কারপ্রাপ্তদের ‘প্রতিদিনের নায়ক’ আখ্যা দিয়ে লিলার বলেন, ‘শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীদের স্থান খুবই সংকুচিত। সবশেষ জাতীয় নির্বাচনে নারীদের কম উপস্থিতির মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়।’

অনুষ্ঠানে ‘স্বপ্ন: উইমেন লিডিং দেয়ার ওন ফিউচার’ শিরোনামে একটি বিশেষ ফটোবুক উন্মোচন করা হয়।

এই বইটিতে ইউএনডিপির ‘স্বপ্ন’ প্রকল্পের আওতায় নারীদের রূপান্তরমূলক যাত্রা তুলে ধরা হয়েছে। অতিদরিদ্র গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দেয় প্রকল্পটি।

এ বছরের নির্ভয়া উদ্যোগটি জেন্ডার-রেসপনসিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন প্রকল্পের সহায়তা ও গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (সিজিএফ) অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে জানায় ইউএনডিপি বাংলাদেশ।