রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) নিয়ন্ত্রণাধীন রাজশাহী সিটি নার্সিং কলেজে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে ৭১ জনকে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন রাসিকের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এবিএম শরীর উদ্দিনের ছেলে ও পুত্রবধূ। এদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়াসহ কলেজের বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখতে রাসিকের গঠিত নিরীক্ষা দল প্রাথমিকভাবে নিয়োগে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কলেজের বর্তমান প্রশাসন দাবি করেছে, নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়নি।
কলেজটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জানান, ২০২৩ সালে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ৭১ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজে যোগ দেন। তবে ওই সময় কলেজটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে থাকা রাজশাহী কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হবিবুর রহমান বলেন, তখন নিয়োগ তো দূরের কথা, কলেজটির সাংগঠনিক কাঠামো বা অনুমোদনই ছিল না।
walton
সরেজমিনে কলেজ পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উপস্থিতি খুবই কম। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজ–সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, প্রতিদিনই অনেকেই অনুপস্থিত থাকেন। বিশেষ করে সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এবিএম শরীর উদ্দিনের ছেলে সিহাব, যিনি ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কলেজে আসছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
নগর ভবনের পশ্চিম পাশে অবস্থিত রাসিকের বহুতল বাণিজ্যিক বিপণিবিতান স্বপ্নচূড়া প্লাজার অষ্টম তলায় প্রায় ৩০ হাজার বর্গফুট জায়গায় কলেজটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কলেজের প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। বাইরের ফটকে নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও ভেতরে কিছু কর্মচারী অবস্থান করছিলেন। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও নিরাপত্তাকর্মী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা কলেজে প্রবেশ করতে বাধা দেন।
লিফট থেকে প্রধান ফটকের দিকে যেতেই একজন নিজেকে কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। অধ্যক্ষের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অধ্যক্ষ কলেজের বাইরে আছেন। অধ্যক্ষের মুঠোফোন নম্বর চাওয়া হলে তিনি তা দিতে অপারগতা জানান। এমনকি নিজের নম্বরও দিতে রাজি হননি।
তিনি জানান, তিনি যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পেয়েছেন। তবে কীভাবে নিয়োগের বিষয়ে জানতে পেরেছিলেন—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তার চাকরি হয়েছে। কোনো লিখিত পরীক্ষা হয়নি এবং আবেদনও করতে হয়নি।
এদিকে তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এবিএম শরীর উদ্দিনের ছেলে সিহাব ও তার স্ত্রী কলেজে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে তারা নিয়মিত কলেজে উপস্থিত থাকেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগের যে সময়কাল উল্লেখ করা হচ্ছে, তখন ড. এবিএম শরীর উদ্দিন রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অবসরের পরও তৎকালীন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সময়ে তার দায়িত্বের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়।
কলেজের অধ্যক্ষের কাছে সিহাব ও তার স্ত্রীর যোগাযোগ নম্বর চাইলে তিনিও তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে সিহাবের বাবা ড. এবিএম শরীর উদ্দিন বলেন, বেতন নিয়মিত না হওয়ায় তার ছেলে হতাশ। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তিনি কোনো প্রভাব বিস্তার করেননি বলে দাবি করেন।
এদিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন পরিচালন ব্যয় কমাতে অনিয়মিত প্রায় ৫০০ কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছে। বিদ্যুৎ ব্যয় কমাতে রাতের সড়কবাতিও কমিয়ে আনা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজশাহী সিটি নার্সিং কলেজের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ১৪ থেকে সাড়ে ১৪ লাখ টাকা ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থসংকটের কারণে কলেজটির ৭১ জনের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে।
কলেজের অনিয়ম তদন্তে রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন সাবেক বিভাগীয় কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক খন্দকার আজিম আহমেদ। সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন রাসিকের বাজেট ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম খান। অন্য সদস্যরা হলেন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফ.এ.এম. আঞ্জুমান আরা বেগম এবং ভেটেরিনারি সার্জন ডা. ফরহাদ উদ্দীন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিরীক্ষা কমিটির একাধিক সদস্য জানান, কলেজটিতে ৭১ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পাওয়া গেছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ নিয়োগ বোর্ড, বিজ্ঞপ্তি ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।
তবে কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান বলেন, ২০২৩ সালের আগস্টে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুনে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং ১ জুলাই থেকে ৭১ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজে যোগ দেন। তিনি তৎকালীন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের স্বাক্ষরযুক্ত একটি ঝাপসা কাগজ দেখিয়ে সেটিকেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বলে দাবি করেন। তবে সেটি কোনো পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়নি। সবকিছু স্বচ্ছভাবে হয়েছে। বেতন বন্ধ থাকায় অনেকেই হতাশ হয়ে কলেজে নিয়মিত আসছেন না।
তবে কলেজটির তৎকালীন (২০২৩–২৪) পরিচালক অধ্যাপক হবিবুর রহমান বলেন, নিয়োগ হলে নিয়োগ বোর্ড হবে, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হবে, ফাইল উত্থাপন ও স্বাক্ষর হবে এবং মৌখিক পরীক্ষার বোর্ড বসবে। এসব প্রক্রিয়া না হলে নিয়োগ হওয়ার কথা নয়। তিনি বলেন, তার দায়িত্বে থাকা সময়ে কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এত বড় সংখ্যক নিয়োগ হলে রাজশাহীতে তা নিয়ে আলোড়ন তৈরি হওয়ার কথা ছিল।
রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম (উপসচিব) বলেন, নিরীক্ষা কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। অনিয়মের বিষয়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছে নতুন করে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
তথ্য সূত্র: এশিয়া পোস্ট








