“কোথাও কেউ নেই আমার” এই ছোট্ট বাক্যটি যেন সমগ্র সময়ের এক নিঃশব্দ আর্তনাদ। মানুষের ভিড়ে ভরা পৃথিবীতে থেকেও একাকিত্বের অনুভূতি নতুন নয়, তবে আধুনিক সময়ে তা যেন আরও তীব্রভাবে ধরা দেয়। পাহাড়, সমুদ্র কিংবা জনস্রোতের মাঝেও মানুষ আজ অনেক সময় নিজেকে খুঁজে পায় না। চারপাশে অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য সম্পর্ক, অসংখ্য ঘটনা তবুও কোথাও যেন একটা অদৃশ্য শূন্যতা রয়ে যায়।
সমসাময়িক সমাজব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষের চিন্তা ও চেতনা নানা টানাপোড়েনে জর্জরিত।উত্তর–দক্ষিণের রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক দ্বন্দ্ব-সবকিছু মিলিয়ে মানুষের জীবন যেন অনেক সময় চোরাবালির মতো হয়ে ওঠে। যেখানে যত এগোনো যায়, ততই ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। আশীর্বাদ, সম্ভাবনা কিংবা ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি এসব অনেক সময় বাস্তব জীবনে এসে দাঁড়ায় কালক্ষেপণের প্রতীকে।
এই প্রজন্মের অনেক মানুষের কাছে জীবন কখনো কখনো “নষ্ট জন্ম” বলে মনে হতে পারে। কারণ তারা দেখছে, নিষ্পাপ স্বপ্নগুলো খুব দ্রুত কলুষিত হয়ে যাচ্ছে। জীবনের পথচলায় যে পদচিহ্ন রেখে যাওয়ার কথা ছিল সৎ ও স্বচ্ছতার, তা অনেক সময় হয়ে যাচ্ছে দ্বিধা আর দ্বন্দ্বে ভরা। আস্থা ও আশার জায়গাগুলোও যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে; মানুষের কাছাকাছি আসা অনেক সময় অযথা বাড়াবাড়িতে পরিণত হচ্ছে।
সমাজের একটি বড় সংকট হলো-মানুষ আজ মুখোশের আড়ালে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সত্যিকারের অনুভূতি লুকিয়ে রেখে মিথ্যে হাসি আর ভান করা সম্পর্কের ভিড়ে মানুষ চলতে থাকে। সেই মুখোশের আড়ালেই জমে ওঠে ক্ষোভ, হিংসা আর অস্থিরতার আগুনের ফুলকি। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তৈরি হয় অস্থিরতার বিস্ফোরণ।
অন্যদিকে মানবসভ্যতার উত্তরাধিকার বিশাল-যেন হিমালয় পর্বতমালার মতোই দৃঢ় ও বিস্তৃত। জ্ঞান, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং অভিজ্ঞতার এই বিশাল ভাণ্ডার মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক সময় মানুষ সেই ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারকে ধারণ না করে বরং তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে মানুষের ভাবনায় জমে ওঠে হতাশা, ক্ষোভ এবং অবিশ্বাস-যেন চিন্তার ওপর থুতু ছিটিয়ে চলে যাওয়ার মতো এক মানসিক অবস্থা।
তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমরা তথ্যসমগ্রের মধ্যে বাস করছি। প্রতিদিন অসংখ্য তথ্য, খবর, বিশ্লেষণ আর আলোচনার ভিড়ে মানুষ যেন আরও বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠছে। সমৃদ্ধ জীবনের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ অনেক সময় মানুষকে ক্লান্ত করে তোলে। প্রত্যহিক আনাগোনার এই জীবনে মানুষ অনেক সময় নিজেকে হারিয়ে ফেলে, বুঝতেই পারে না তার আসল লক্ষ্য কোথায়।
তবুও অন্ধকারের মধ্যে কিছু আলো থাকে। সন্ধ্যাতারার মতো কিছু আশা মানুষের পথ দেখায়। জীবনের কঠিন সময়েও কিছু ছোট ছোট আলো ভালোবাসা, সহমর্মিতা, মানবিকতা-মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
কিন্তু বাস্তবতার আরেকটি কঠিন দিকও রয়েছে। বিশালতার মাঝেও অনেক সময় মানুষ হয়ে যায় বেওয়ারিশ, উপেক্ষিত কিংবা নিষিদ্ধ। সমাজের বড় বড় সিদ্ধান্ত, তদন্ত, ক্ষমতার হিসাব-এসবের মাঝে সাধারণ মানুষের কথা অনেক সময় হারিয়ে যায়। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের চুক্তিপত্র, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক সমীকরণ-সবকিছু মিলিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো যেন অদৃশ্য হয়ে যায়।
বিশ্ব অর্থনীতি, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার চুক্তিগুলো অনেক সময় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির ভেতরেও থাকে প্রশ্ন, থাকে গোপনীয়তা আর স্বার্থের দ্বন্দ্ব। অনেক সময় সেই গোপনীয়তা ভেঙে পড়লে মানুষ উপলব্ধি করে— বাস্তবতা সবসময় ঘোষিত আদর্শের মতো নয়।
এই প্রেক্ষাপটে “দুঃখিত” শব্দটি যেন একটি গভীর উপলব্ধির প্রতীক। ব্যস্ততার এই যুগে মানুষ অনেক কিছু হারিয়ে ফেলছে-সম্পর্ক, অনুভূতি, সময় এবং মানবিকতা। ব্যস্ততা যেন এমন এক শক্তি, যা মানুষকে নিজের কাছ থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়।
আজকের পৃথিবীতে হাজারো ইস্যু, হাজারো বিতর্ক আর দুরভিসন্ধির মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ মানুষ অনেক সময় নিজেকে অজ্ঞাতনামা বলে মনে করে। তার পরিচয় নেই, তার কণ্ঠস্বর নেই-সে যেন বিশাল সমাজযন্ত্রের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।
তবে এই অজ্ঞাতনামা মানুষরাই আসলে সমাজের আসল শক্তি। তাদের জীবন, সংগ্রাম, আশা আর স্বপ্ন দিয়েই গড়ে ওঠে একটি জাতির বাস্তব চিত্র। হয়তো তারা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে না, কিন্তু তাদের নীরব উপস্থিতিই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায় -মানুষ কি সত্যিই একা? নাকি এই একাকিত্বই তাকে নতুন করে নিজেকে খুঁজে নিতে শেখায়?
সম্ভবত উত্তরটা লুকিয়ে আছে মানুষের ভেতরেই। কারণ পৃথিবীর সব ভিড়ের মাঝেও মানুষ যখন নিজের ভেতরের আলোকে খুঁজে পায়, তখন আর সে অজ্ঞাতনামা থাকে না।তখন সে হয়ে ওঠে নিজের গল্পের নায়ক।
আশরাফুল অন্তর
সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী








