শারদীয়া দুর্গোৎসব মানেই শুধু ধর্মীয় অনুষঙ্গ নয়, বরং বাংলার হিন্দু সমাজে এটি হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গাকে ঘিরে বাঙালির আবেগ, ভক্তি এবং পারিবারিক টান যেন এক অপূর্ব সম্মিলন।
পুরাণ অনুসারে, হিমালয়ের কন্যা উমা কৈলাসে স্বামী শিবের সঙ্গে বসবাস করলেও প্রতি বছর শরতে ফিরে আসেন বাপের বাড়ি। আর সেই প্রত্যাবর্তনের আনন্দেই বাংলার ঘরে ঘরে আয়োজিত হয় দুর্গাপূজা। আগমনী গান, বোধন, আর ষষ্ঠীর আমেজে শুরু হয় পাঁচ দিনের বর্ণময় উৎসব।
বাঙালির চোখে দুর্গা কেবল দশভুজা মহিষমর্দিনী নন, বরং তিনি ঘরের মেয়ে—বাপের বাড়ি ফেরা কন্যা। আগমনী গানেও ধরা পড়ে সেই মায়ের কণ্ঠস্বর:
*”যদি আসে মৃত্যুঞ্জয় / উমা নেবার কথা কয় / তখন মায়েঝিয়ে করব ঝগড়া / জামাই বলে মানিব না।”*
বহু গবেষক ও নৃবিজ্ঞানী মনে করেন, এই মাতৃকাপূজার ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। সিন্ধু সভ্যতা কিংবা ইউরোপের প্রাগৈতিহাসিক ‘ভেনাস’ মূর্তিতেও পাওয়া যায় মাতৃত্বের প্রতীকী উপস্থাপনা। প্রাচীন মানুষের কাছে প্রকৃতি ও মাতৃত্ব ছিল একই সূত্রে গাঁথা—উভয়ই সৃষ্টি করেন, লালন-পালন করেন।
দুর্গাপূজায় সেই আদিম মাতৃত্বেরই আধুনিক রূপ ফুটে ওঠে। নবপত্রিকা, সন্ধিপূজার বলি, এবং পার্বতীর সপরিবার আগমন—সবকিছু মিলে পূজা হয়ে ওঠে বাংলার গৃহস্থজীবনের প্রতিচ্ছবি।
মধ্যযুগীয় সাহিত্যে—চণ্ডীমঙ্গল, রামপ্রসাদী গান—দুর্গার সপরিবার রূপই বেশি গুরুত্ব পায়। গবেষকদের মতে, এই সময় থেকেই বাঙালির পূজায় দুর্গা হয়ে উঠেছেন “আপন ঘরের মেয়ে”।
এবছরও রাজ্যের সর্বত্র দুর্গোৎসব শুরু হয়েছে ব্যাপক উৎসাহে। কলকাতা, নদীয়া, বর্ধমান, বীরভূম, শিলিগুড়ি সহ নানা জেলায় মণ্ডপে ভিড় করছেন ভক্তরা। করোনা পরবর্তী বছরগুলোয় আবারও পূর্ণ উদ্দীপনায় ফিরেছে পুজো।
সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকরা বলছেন,“দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে এর মানবিক রূপ। একদিকে যেমন তিনি অসুরবিনাশিনী, তেমনি অন্যদিকে তিনি মা, কন্যা, ভগ্নী। এই দ্বৈততা দুর্গাকে অন্য যেকোনো দেবীর চেয়ে বাঙালির কাছে আপন করে তোলে।”
পূজার শেষে বিজয়া দশমীতে যখন দেবী বিদায় নেন, তখন শুধু একটা প্রতিমা নয়—ঘরের আদরের মেয়েকেই যেন বিদায় জানায় বাংলার মন।








