রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের রাস্তার দুইপাশে পরিত্যক্ত খেত কিংবা বাড়ির আশপাশে ধনে পাতার মতো সবুজ গাছের ঝোঁপ শোভা পাচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে এটা নয়নাভিরাম দৃশ্য। কিন্তু শোভা বাড়ানো ভিনদেশি উদ্ভিদ (আগাছা) হচ্ছে বিষাক্ত পার্থেনিয়াম। কয়েক বছর আগেও খুব একটা দেখা না মিললেও এখন মহানগরীর অনাচে-কানাচে ও এ অঞ্চলের সবত্র ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত এই গাছটি। এতে একদিকে মানুষ ও গবাদিপশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বেড়েছে, অন্যদিকে ফসল উৎপাদনও কমে আসছে। এছাড়া মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য।
মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক বলেন, গাছটির ফুলের রেণুতে রয়েছে রাসায়নিক পদার্থ। যা নিশ্বাসের সঙ্গে নাকে প্রবেশ করলে জ্বর, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। ক্ষতস্থানের মাধ্যমে রক্তে মিশে চর্মরোগও সৃষ্টি করে। যাদের অ্যালার্জি রয়েছে, এর রস তাদের চামড়ায় লাগলে ভয়াবহ রোগও হতে পারে।
রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মহানগরীর অধিকাংশ সড়কে ও জেলার প্রতিটি উপজেলার বড় রাস্তা, ফসলি জমিসহ প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ রাস্তার দুইপাশে সৌন্দর্য বর্ধনকারী গাছের মতো পার্থেনিয়াম জন্মেছে। দেখা মনে হয়, নিয়মিত পরিচর্যা করে এ গাছগুলো বড় করা হয়েছে। স্কুলগামী শিশুরা রাস্তার পাশের এই আগাছাকে ফুল ভেবে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়রা এ আগাছা গরু-ছাগলকে খাওয়াচ্ছেন।
পার্থেনিয়াম (Parthenium) আগাছাটি ডেজি পরিবারের মধ্যে সূর্যমুখী উপজাতের উত্তর আমেরিকান গুল্ম প্রজাতির বংশধর। শিরাযুক্ত, নরম কাণ্ডবিশিষ্ট একবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় এ আগাছার নাম গ্রিক শব্দ (parthenos) থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ ‘কুমারী’ বা (parthenion)। এটির উৎপত্তি উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার সাব ট্রপিক্যাল অঞ্চল, মেক্সিকো ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে। বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশে এটি ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ আগাছার উচ্চতা দুই থেকে তিন ফুট, আয়ুকাল তিন থেকে চার মাস। চিকন সবুজ পাতার ফাঁকে ছোট ছোট সাদা ফুলে আকর্ষণীয় দেখায় গাছগুলোকে। ত্রিভুজের মতো ছড়িয়ে থাকে এর অসংখ্য শাখা।
`রাজশাহীর তানোর, দুর্গাপুর, বাগমারা, পুঠিয়া, চারঘাট ও বাঘা উপজেলায় পার্থেনিয়ামের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। পার্থেনিয়ামের সবচেয়ে পুকুর পাড়, অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক, আম বাগান, কৃষি জমি ও আঙিনায় বেশি জন্মায়। ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত এ আগাছা। অন্তত ২৫ ধরনের ফসলের ক্ষেত থেকে শুরু করে প্রায় সব জায়গায় নির্বিঘ্নে বেড়ে উঠছে বিষাক্ত এই গাছটি।’
জানা যায়, পার্থেনিয়ামের তথ্য অনুসন্ধানে ২০০৮ সালে বাংলাদেশে আসেন অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্টিভ অ্যাডকিনস। তার সঙ্গে ছিলেন দেশের একদল কৃষি বিজ্ঞানি। তারা ওই সময় যশোর অঞ্চলে আগাছাটির উপস্থিতি প্রথম শনাক্ত করেন। প্রথম দিকে রাস্তার দুই পাশেই কেবল এ উদ্ভিদের উপস্থিতি চোখে পড়ত। পরে তা পতিত জমি ও ফসলের খেতে ছড়িয়ে পড়ে।
কৃষিবিজ্ঞানী ডা. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, গত এক যুগের বেশি সময় ধরে পার্থেনিয়াম নিয়ে কাজ করছি। ২০১১ সালে যখন কাজ শুরু করি তখন অনেকের কাছেই বিষয়টি হাস্যকর মনে হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে খুব ভাল সাড়া পাচ্ছি। পার্থেনিয়াম এতটাই বিষাক্ত আগাছা মানুষের শরীরের স্পর্শে আসলে চর্ম রোগ হয়। ছাগল, গরু, ভেড়ার মতো গবাদিপশুরা এ আগাছা খেলে মুখে ঘা ও ডায়রিয়া হয়। তিনি আরও বলেন, পার্থেনিয়াম ফসলের খেতে জন্মালে সে ফসলের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। একটি পার্থেনিয়াম গাছ থেকে ৬০ হাজার নতুন গাছের জন্ম হতে পারে। রাজশাহী ও যশোর এলাকায় এ আগাছার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।
তানোর উপজেলার কামারগাঁ ইউনিয়নের হালিমা বেগম জানান, পার্থেনিয়াম সর্ম্পকে আমাদের কোন ধারণাই নেই। আমরা এটার নামও আগে জানতাম না। ফুল ফুটে দেখতে সুন্দর লাগে। তাই পাশে বসেই গরু ও ছাগল চরণ করি। শিশু বাচ্চারাও এ গাছের ফুল নিয়ে খেলা করে।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আজিজুর রহমান বলেন, বিষাক্ত ও ভয়ানক আগাছা পার্থেনিয়াম দিয়ে ভরে গেছে সারা দেশ। মানব স্বাস্থ্য, পশু স্বাস্থ্য, কৃষি ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে। নীরবে বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে এ আগাছাটি। ইতোমধ্যে পার্থেনিয়ামের ফুল ফুটতে শুরু করেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তী বছরের মধ্যে এর বীজের মাধ্যমে আরও ব্যাপকভাবে বিস্তার ঘটবে।
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মদ বলেন, এ অঞ্চলে বিষাক্ত পার্থেনিয়াম ছিল না। গত কয়েক বছর থেকে এটা ছড়িয়ে পড়ছে। এটা যে বিষাক্ত বা স্বাস্থ্যর ক্ষতির কারণ অনেকেই জানেন না। আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে নিদের্শ দিয়েছি।
বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট রাজশাহী অঞ্চলের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রাক অথবা গরু মহিষের বিষ্টার সঙ্গে হয়তো এর বীজ চলে এসেছে। রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে দ্রুত এই আগাছা ছড়িয়ে পড়েছে। ফসল ও পরিবেশ রক্ষায় এ আগাছা নিধনে আমাদের সকলের কাজ করা উচিত।
এফএ/এসআর








